12694728_10153866170940050_2729914294236216092_oশীতের রাতে, কাঁপতে কাঁপতে বাসা থেকে বের হলাম ৷ আজকে হঠাৎ করেই শীত পরে গেল ৷ এত শীত পরবে কোনও আইডিয়া ই দেয় নাই ৷ সাধারণত ভীষণ শীত পরার আগে ছোটখাটো একটা বৃষ্টি হয় ৷ কিন্তু এবার ত, তা হল না ৷
আমার গায়ে একটা জিনস, টি শার্ট আর একটা শার্ট উপড়ে পরা ৷ শীত মানছে না ৷ এখন রাত প্রায় ১ টা ছুঁই ছুঁই করে ৷ বাবা মা আমার বোন ঢাকার বাইরে গেছে ৷ ৷ এই রাত ১ টায় খুদা পেয়েছে ৷ খুব ইলিশ চিংড়ি মাছ খেতে ইচ্ছে হচ্ছে ৷ তাই আমি চিংড়ি মাছের সন্ধানে বের হয়েছি ৷

আমার বাসা থেকে বের হবে আমি কোন দিকে যাব বুঝতে পরছি না , বাম দিকে গেলে বেশ কয়েকটা হোটেল আছে ৷ আমি সে দিকেই হাটা দিলাম ৷ কিছুক্ষণ হাটার পর বুঝতে পারলাম হাঁটলে শীত কমে, শরীর গরম হয় কথাটা একদম ভুয়া ৷ মানুষ এই ভুয়া কথাটা কেন দিব্বি চালিয়ে দেয় বোঝা গেল না ৷ তবে ব্যাপার টা অন্য রকম হতে ও পারে ৷ হয়তো আমি কোনও শীতের কাপড় পড়ি নাই , তাই হতে পারে ৷
আমি হন হনিয়ে হাটছি , প্রচন্ড খুদা পেটে, আমার খুদা লাগলে শরীর কাঁপতে থাকে ৷ কেন এমন হয় জানি না ৷ এই সমস্যাটা নতুন হয়েছে ৷ হাটছিলাম, এক বৃদ্ধ রিকশা চালায়, আমাকে বলল, কই যাবেন ? তার গলায় রীতিমত হুমকি! যেন তার রিকশায় না উঠে আমি মহা অন্যায় করেছি , তার ন্যায্য পাওনা ওটা ৷ আমি বললাম, চিংড়ি খেতে যাই ৷ যেখানে চিংড়ি আছে সেথায় যাই ৷
আমার কথায় লোকটা মহা বিরক্ত হল ৷ আমি আবার ঝাড়ি দিবে এই ভয় এ একটু মলিন হাসি দিলাম ৷ মুখ ভেংচি দিয়ে চলে গেলেন উনি ৷ আমি আবার হাটতে শুরু করলাম, এদিক সেদিক তাকাই আর হোটেল খুঁজি ৷ কোনও হোটেল ই খোলা পাচ্ছি না ৷ আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল ৷ শেষে ভাবলাম আরেকটু সামনে যাই নিশ্চয়ই কিছু পাব ৷ আমি আর ঘণ্টা খানেক হাঁটলাম ৷ হাটে হাটতে মৌচাক চলে এসেছি ৷ রাত প্রায় ৩ টা ছুঁই ছুঁই করে ৷ প্রচন্ড খুদা আর ক্লান্তি আমাকে ভর করেছে ৷ একটু বিশ্রাম দরকার ভেবে আমি ফট পাথ এ বসে পড়লাম ৷ একটু জল পেলেও মন্দ হত না ৷ বসতেই শীত আমাকে জেঁকে ধরল ৷ মনে মনে ভাবলাম ওকে গর্ধব হাঁটলে শীত কমে না, বসে থাকলে শীত বাড়ে ৷ এই জিনিস টা তোমরা গোলমাল পাকিয়েছ ৷
হঠাৎ খেয়াল করলাম কোথা থেকে এক বাচ্চা বয়সী ছেলে এসে আমার পাশে বসেছে ৷ আমি থতমত খেয়ে গেলাম ৷ বাচ্চাটার বয়স ৮-৯ বছর হবে ৷ একটা হাফ-পেন্ট আর শরীরে একটা চটের বস্তা মোড়ানো চটের বস্তার নিচে, কোনও কাপড় আছে বলে আমার মনে হল না ৷ মৃদু ল্যাম্প এর আলোয় ছেলেটার উচ্ছল হাসি দেখতে পেলাম ৷ যেন একজন সঙ্গী পেয়ে সে বেজায় খুশি ৷ ছেলেটা কেন হাসছে জিজ্ঞেস করলাম ৷ সে কোনও কথা বলল না ৷ সে আবার হাসল, আমি মনে মনে ভাবলাম, কত কষ্টের মাঝেও মানুষ শুখি থাকে ৷
বিশ্রাম নেওয়ার পালা শেষ, উঠতে যাব, ছেলেটা আমাকে বলল মামা কি হল দিবেন না ? আমি কিছুটা অবাক হলাম কি দেব ? আমার কি কিছু দেয়ার কথা ? টাকা চাইছে ? জিজ্ঞেস করলাম, ছেলেটা আবার একটা হাসি দিল, কেন মামা ঢং করতেছেন, দেন দেন, আপনার জিনিস রেড়ি ৷ আমি ছেলেটাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম ভাই আমি সেই লোক টা তুমি যাকে ভাবছ ৷ ছেলেটা এবার ক্ষেপে গেল ৷ হাসি মুখ, নিষ্পাপ চেহারাটা হয়ে উঠল কর্কশ আর কঠিন , আমাকে হুমকি দিয়ে বলল কাজটা ভাল করলা না, ভাই সকালে তোমারে বানাইব ৷
এখানে আর থাকা ঠিক হবে বলে মনে হল না আমি আবার হটা দিলাম রাত প্রায় ৪ টা বাজে বাজে করছে ৷ এখন যদি কাওরান বাজার রওনা দিব ৫ টা নাগাদ পৌঁছানো যাবে , ৬ টার দিকে নিশ্চয়ই চিংড়ি মাছ পাব মাছের আড়ত এ ৷
আমি রওনা দিলাম চিংড়ি মাছ এর বংশ উদ্ধার করতে ৷ কিছুদূর হাটার পর আমি খেয়াল করলাম সেই ছেলে টা আমার পিছু নিয়েছে ৷ মনে মনে ভাবলাম বেটা মহা বদ ৷ এই বয়সে কিসে জড়িয়েছে এখন আবার আমাকে ফলো করছে ৷ ধরে কান মলে দেয়া উচিত ৷ অবশ্য কান মলে দেয়া understatement হয়ে গেল ৷ আসলে উচিত ধুমায়ে পিটানি দেয়া ৷
আমি এবার হাত দিয়ে ইশারা করলাম ছেলেটাকে , ছেলেটা আবার হাসছে, কেন হাসছে আমার কোনও আইডিয়া নাই ৷ বললাম সমস্যা কি ? পেছন পেছন লেজের মত আসছ কেন ? ছেলেটা আবার হাসল ৷ বলল, আমার ইচ্ছা ৷ রাস্তা কি আপনের বাপ এর ? আমি রীতিমত একটা চড় লাগিয়েই দিতাম ৷ নিজেকে সামলে নিলাম ৷ পড়ে বললাম পেছন পেছন এস না, তুমি যাকে খুঁজছ আমি সে না ৷
বলে হাটতে শুরু করলাম ৷ ভোর ৫ টার দিকে আমি কাওরান বাজার পৌছুলাম কাওরান বাজার রাতে ঘুমায় না ৷ চিংড়ি খাব এই আসায় বের হয়ে এখন একটা টং দোকানে আমি চা খাচ্ছি ৷ চা টা ভীষণ , মজা হয়েছে, চিনি, দুধ ছাড়া চা ৷ যখন ৬টা বাজল তখন কাওরান বাজার এ মানুষের কিচির মিচির এ মুখর হয়ে উঠেছে ৷ আমি মাঝের দোকান গুলোতে যে কোথাও চিংড়ি মাছ পেলাম না ৷ আমার মাথা খুব ঠান্ডা ৷ আমি সহজে রাগি না ৷ কিন্তু আমার মাথা ক্রমশই গরম হচ্ছে ৷ সারাটা রাত আমি হেঁটেছি ৷ এই হোটেল খোলা পাব ভেবে একটু হেটে সামনে যেয়ে যখন দেখেছি হোটেল বন্ধ তখন ভেবেছি আরেকটু হাটি সামনে নিশ্চয় আছে আরেকটা হোটেল কিন্তু এমন করতে করতে শেষ পর্যন্ত এই কাওরান বাজার এ ও আমি ঘণ্টা খানেক হাঁটলাম কোনও চিংড়ি মাছের নাম গন্ধ নায় ৷ ভীষণ রাগ হল আমি কাওরান বাজার থেকে একটা বাসে করে আমার বাসার গলির সামনে নামলাম ৷ নেমে আমি যা দেখলাম তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না ৷ আমার, সেই ছেলেটা ! আমার বাসার গলির সামনে দাড়িয়ে আছে !
ছেলেটা এবার রীতিমত দাঁত কেলিয়ে হাসছে ৷ আমার এত রাগ কবে উঠেছে বলতে পারব না ৷ না জানি কপালে কি আছে এই ছেলে তো মহা ধুরন্ধর ৷ আমি চিৎকার করে বললাম এই ছেলে , বদমাশ, আমার বাসায় চলে এসেছিস, কি চাস ? ছেলেটার মুখ আরেকটু চওড়া হল, সে হাসলে বলে, আপনার জিনিস রেড়ি টাকা দিলেই তো আমি চলে যাই ৷ তাড়াতাড়ি ৬৩০ টাকা বের করেন দাম ৫৭০ টাকা কিন্তু বাকি ৬০ টাকা আমার খরচা ৷ খরচা ১০ টাকা ছিল কিন্তু আমি আজাইরা হাটাইলেন ৫০ টাকা জড়ি মানা ৷
ছেলেটার কথা শুনে আমার ইচ্ছা হচ্ছিল কষে একটা চড় দেই ৷ আমি মানুষকে চড় মারায় খুব ওস্তাদ ৷ একটা মজার ঘটনা বলি, একবার আমি এক ছেলেকে চড় মেরে তার কানের পর্দা ফাটিয়ে দিয়ে ছিলাম, মজার ঘটনা কেন জানি না, ব্যাপারটা হরিবল ৷ ছেলেটা আমার কাছের মানুষ নিয়ে বাজে কথা বলেছিল ৷
যাই হোক, আমি উটকো ঝামেলা থেকে মুক্তি চাই ৷ আমার পকেটে ১০০০ টাকা ছিল ওর দিকে বাড়ি বললাম নে যা, ঝামেলা থেকে মুক্তি দে, কোনও কিছু লাগবে না ৷ সে আমাকে একটা পলিথিন ব্যাগ পাড়িয়ে দল ৷ আমি এদিক সেদিক দুই দিক থাকলাম ৷ ওর চটের ভিতর ওই ব্যাগ ছিল ৷ আমি নিচু গলায় ভয়ে ভয়ে বললাম লাগবে না তো তোর জিনিস কোথাও ফেলে দে ৷ ছেলেটা আমার কাছে এগিয়ে এসে আমার হাতে ব্যাগটা গুজে দিল ৷ আর বলল, আপনার ইচ্ছে হলে আপনি ফেলান, আমি পারব না আমার পৌঁছায় দেয়ার কথা দিসই ৷
আমি ভীষণ নার্ভাস ভাবে দ্রুত বাসায় ঢুকে পড়লাম ৷ কি আছে কপালে কে যাবে কি দিয়েছে ? অবৈধ কিছু ! এখনি যদি পুলিশ ঢুকে আমার বাসায় এসে বলে মি. রাজু আপনাকে গ্রেফতার করা হল illigal substance রাখার দায় এ ৷ আমি মনে মনে দোয়া দুরুজ পড়ে পলিথিন ব্যাগটা খুলতে যাব তখন মনে হল আরও খারাপ কিছু যদি হয় ? ব্যাগটা প্রায় দুই কেজি হবে ৷ কি আছে এতে আমি ব্যাগটা খুল্লাম না ৷ হঠাৎ আমার বাসায় দরজায় ঠুকো পড়ল, ঠক ঠক, বাসায় মানুষ আসলে আমার ভীষণ খুশি লাগে, কিন্তু আমি মনে মনে ভাবলাম dear god, আমাকে রক্ষা কর ৷ নিশ্চয় পুলিশ ! আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে কেউ নিশ্চয় ৷ আমার সারা শরীর অবশ হয়ে গেল ৷ আরও বেশ কয়েকবার ঠুকো পড়ল ৷ আমি জমে গেছি ৷ হঠাৎ খেয়াল করলাম দরজা খেলোর শব্দ সেরেছে রে, পুলিশ না আরও ভয়ঙ্কর ব্যাপার বাবা মা আপু চলে এসেছে নিশ্চয় নাহলে ঘড়ের চাবি কই পাবে ৷ আমি কি করব ভেবে দেখলাম পাশেই ফ্রিজ , পলিথিন ব্যাগটা ওটায় ছুড়ে দিয়ে আমি বিছানায় কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমের ভান ধরলাম ৷
আমি শুনতে পারছি বাবা মা আর আপুর গলা ৷ সবাই হাসি ঠাট্টা করছে ৷ আমি এত বেলা করে ঘুমোচ্ছে দেখে আমাকে বকাও দেয়া হল ৷ সেদিকে আমার খেয়াল নেই ৷ ঈশ, ব্যাগটা আমার বাইরেই ফেলে আসা উচিত ছিল, সবাই বাইরে থেকে এসেছে নিশ্চয় রেস্ট নিবে এই ফাকে আমি ফেলে আসব ৷ এসব ভাবতে ভাবতে আমি সারা রাতের ক্লান্ত নিঘুম শরীরে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম জানি না ৷
যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন দুপুর , আপুর ধাক্কায় আমার ঘুম ভাঙ্গল ৷ এই রাজু কিরে, আর কত ঘুমাবি ? আমরা ছিলাম না আর তুই কি করেছিস একা বাসায় হ্যাঁ ? এতক্ষণ ঘুমায় ? মা চিংড়ি মাছ রাঁধছে চিংড়ি গুলো খুব ভাল এনেছিস রে বড় বড়.. ওঠ জলদি ওঠ ৷ আমরা কি কি এনেছি দেখবি না …আমি আপুর কথার কোনও আগা মাথা বুঝলাম না…