আমি আর আমার বন্ধু রিফাত মিলে আমরা নিকুঞ্জ এর একটা বাসায় থাকি ৷ বাড়ির নাম শহর আলী ৷ মালিক ভদ্রলোক মারা গেছেন ৷ আমরা ৫ তলায় থাকি ৷ আমি সারাদিন আমার ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকি ৷ কোনও কাজ নাই ৷ বেকার মানুষ, বেকার হিসাবে যাতে পরিচয় না দিতে হয় সেই জন্যে আমি MBA করছি৷ আমার বন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ MBA করছে ৷ তবে সে বেকার না ৷ গতবারের BCS এর প্রিলিমিনারিতে টিকেছিল ৷ Written এ বাদ পড়ে যায় ৷ এবার আবার দিচ্ছে ৷ সে মহা ব্যস্ত ৷ এর মাঝে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন ব্যাংক এ Viva এর ডাক পেয়েছে ৷ আর আমি ভার্সিটি আসি যাই, দিন কাটাই আমাকে কেউ ভাইভা তে ডাকে না ৷ কয়েকদিন আগে একটা ব্যাংক এ written দিয়েছিলাম, হয় নাই ৷


এখন সকাল ৮ টা আমি এত ভোরে কেন উঠে গেলাম বুঝতে পারছি না ৷ আমার বন্ধুর কোনও সাড়া শব্দ পাচ্ছি না ৷ ও মনে হয় উঠে নাই ৷ আমার এক কাপ কড়া কফি খেলে ভাল হতো ৷ কিন্তু কফি খেতে হলে নিজের বানিয়ে খাওয়া লাগবে ৷ আমার অবশ্য নিজের বানিয়ে খাওয়ার তেমন কোনও ইচ্ছে নাই ৷ রিফাত খেলে ওকে বললে ও বানিয়ে দেয় ৷ যেহেতু ওর কোনও সাড়া শব্দ নাই তাই আপাতত কফি খাওয়ার কোনও সম্ভাবনা দেখছি না ৷ আমি আবার শুয়ে পড়লাম ৷ আরেকটু ঘুমানো যাক ৷ প্রায় তিন ঘণ্টা পড় যখন আমার আবার ঘুম ভাঙ্গল তখন ১১ টার বেশি বাজে ৷ যদিও ১১ টা কে সকাল ধরা হয় আমার এতে যথেষ্ট আপত্তি আছে ৷ আরে ১১ টা তো ভোর ৷ এত ভোরে উঠে আমি সারাদিন কি করব বুঝতে পারছি না ৷ উঠে বসে কান পেতে কোনও সাড়া শব্দ আছে কিনা বোঝার চেষ্টা করে আমি হতাশ হলাম ৷ আজ বোধয় কপালে কফি নাই ৷
আমি যখন আবার ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তখন আমার ফোন টা বেজে উঠল ৷ ফোনের দিকে তাকিয়ে যখন দেখলাম unknown নাম্বার তখন ফোন ধরার কোনও ইচ্ছা পোষণ করলাম না ৷ যে ব্যাটা ফোন দিয়েছে সে ভীষণ ধৈর্যশীল মানুষ ৷ এক টানা ৮ বার ফোন দিচ্ছে ৷ একটা unanswered call এ ৪৫ সেকেন্ড লাগে ৷ তার মানে সে ৬ মিনিট ধরে চেষ্টা করছে ৷ আমার আনন্দ আরও বহু গুনে বেড়ে গেল ৷ দে দে ইচ্ছা মত ফোন দে ৷ অনিচ্ছা সত্তেও আমি উঠলাম ৷ দাঁত ব্রাশ করতে করতে রুম থেকে বের হলাম ৷ কোথায় যেন পড়েছিলাম হেটে হেটে দাঁত ব্রাশ করলে গুনাহ্ হয় ৷ যদিও আমি নামাজ কালাম পড়ি না পড়তে ইচ্ছা ও হয় না কিন্তু হেটে হেটে দাঁত ব্রাশ করতে মনের ভেতর খচ খচ করছে ৷ ধর্মীয় অনুভূতি অদ্ভুত ! ধর্মের ধ নাই হেটে হেটে ব্রাশ করা নিয়ে আমি চিন্তিত ৷ চিন্তা আরেকটু সম্প্রসারিত হল যখন দেখলাম আমার বন্ধুকে তার রুমে না পেয়ে ৷ তার বাথরুমে ও নাই কিচেন এ ও নাই ৷ সাধারণত রিফাত সকালে বের হয় না ৷ কিচেন থেকে বের হতে হতে ফ্রিজ খুলে দেখলাম ফ্রিজে যথেষ্ট পরিমাণ বাজার সদাই আছে , সুতরাং বাজারে যাওয়ার ও কথা না ৷
হাত মুখ ধুয়ে আমি একটা লিস্ট করা শুরু করলাম কোথায় কোথায় যেতে পারে ৷ আমার লিস্ট টা এরকম
১৷ বাজারে (যদিও বাজার আছে, তবু যেতে পারে)
২৷ ভার্সিটিতে (যদিও MBA এর ক্লাস রাতে, যেতে পারে)
৩৷ কোথাও চাকর হওয়ার Exam আছে (যদিও আমার দোয়া না নিয়ে সে যায় না, এবং চোদ্দ গুষ্টির, ঘুমিয়ে ছিলাম বলে হয়তো জানি না)
৪৷ বেড়াতে গেছে (বেড়াতে গেছে মানে dating এ গেছে, যদিও সে মেয়েদের থেকে সতর্ক দূরত্ব রাখে, এবং সে ছেলে অতি ভদ্র বাবা মা এর পছন্দেই বিয়ে করবে)
আমার ফোন টা আবার বাজা শুরু করায় আমার চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটল ৷ আমি মনে মনে ভাবতে থাকলাম এটা নিশ্চয়ই রিফাত এর ফোন ৷ ও নিশ্চয়ই কোনও বিপদে পড়েছে ৷ বাইরের কোনও নাম্বার থেকে ফোন দিচ্ছে ৷ সাহায্য দরকার ৷ মনে মনে হাসলাম ৷ খুব ভাল হয়েছে বুঝ ঠেলা ৷ দিতে থাক ফোন আমি ধরছি না ৷ আমি নিচে নামলাম ৷ breakfast এর সন্ধান করতে হবে ৷ breakfast নাকি দিনের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার ৷ তবে এখন ১২ টা বাজে ৷ ইহা breakfast নাকি lunch তা নিয়ে একটি ভাল বিতর্ক হতে পারে ৷ বিতর্কের বিষয় হবে এমন ৷ ঘুম থেকে উঠে বেলা ১২ ঘটিকায় কিছু খেলে সেটি আর break fast বলে গণ্য করা যায় না ৷ এই যুক্তির পক্ষে থাকবে এক দল বিপক্ষে থাকবে এক দল ৷ কোন দলের কে নিজে কি ভাবে তার কিন্তু জানার দরকার নাই ৷ সঞ্চালক তার মনের ইচ্ছে মত আপনাকে ধরিয়ে দিবে আপনি পক্ষে না বিপক্ষে ৷ আপনি এর পর আপনার নিজের কি মনে হয় তা ভাবা বাদ দিয়ে ধুমায়া চাপা বাজি করতে থাকবেন ৷ যে বেশি চাপাবাজি করতে পারবে সেই সেরা বিতার্কিক ৷ তালি !!!

বাইরে প্রচন্ড শীত ৷ আমি একটা টি শার্ট আর জিন্স পড়া ৷ পায়ে এক জোড়া স্যান্ডেল ৷ আমার আপাতত গন্তব্য হল নিকুঞ্জ ১৯ নাম্বার রোড দিয়ে সোজা মেইন রোড এ বের হওয়া ৷ তার পর অবশ্য কি তা জানি না ৷ হাটতে হাটতে আলী ভাই এর দোকান এর সামনে চলে এলাম, আলী ভাই আমাকে ডাক দিল , বলল ভাইজান কেমন আছেন ৷ আমি তার সাথে কথা বলার বিশেষ আগ্রহ না থাকা সত্তেও তার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিলাম ৷ আমি কেমন আছি তার জানার খুব একটা দরকার আছে বলে মনে করি না ৷ যা শুনলে সে খুশি হবে তাকে তাই শোনালাম ৷ ভাই একটা পেপসি দেন, সে পেপসি বের করতে করতে বলল, ভাই কেমন আছেন মন মেজাজ খারাপ নাকি? এই ঠান্ডায় পেপসি খাবেন ! আমি মনে মনে বললাম তো শালা কি খাব ? তুই তো তিন নাম্বার চা বেচিস ৷ কুত্তা ও খাবে না তোর চা ৷ আমি হাসি দিয়ে বললাম ভাই রিফাত রে দেখেছেন আজকে? আলী সাহেব তার ৩২ টি দাঁত বেড় করে বলল জি না, তাকে তো গত এক সপ্তাহ ধরে দেখি না ৷ মনে মনে ভাবরাম শালার কারে কি জিজ্ঞেস করতে আসছি ৷ আমি তাকে টাকা বুঝিয়ে দিয়ে আমার পথে রওনা দিলাম ৷
পেপসি টা তেমন ঠান্ডা না ৷ এমন ঠান্ডা দিনে এই পেপসি আমার গলায় গরম লাগছে , এর চেয়ে তিন নাম্বার চা খাওয়া ও ভাল ছিল৷ আমার মেইন রাস্তায় যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে ও বৃষ্টি জেনারেল ষ্টোর এর গলি দিয়ে ১৮ নাম্বার রোড এর দিকে এগুচ্ছি এখন ৷ ১৮ নাম্বার রোড এ একটা বাড়ির সামনে পড়তেই একটা বন্ধুর কথা মনে পড়ে গেল ৷ সে আগে ঐ বাড়িতে থাকত ৷ undergrad এ থাকতে সে London চলে যায়৷ ইদানীং দেশে ফিরে এসেছে ৷ সে ডেইলি ১০ বার facebook এ বাংলাদেশ কে নিয়ে নাক সিটকিয়ে status দেয় ৷ ৩ বার বউ এর সাথে ঝগড়া করে পোষ্ট দেয় আর ২ বার সে কত briliant তা প্রমাণ করতে পোষ্ট দেয়৷ আমি আবার বায়ে মোড় নিয়ে মেইন রাস্তার দিকে এগুলাম ৷ মেইন রাস্তার কাছা কাছি যে একটা গোলাপী বাড়ি আমার সামনে পড়ল ৷ এই নিকুঞ্জে এরে কত রকম রঙের বাড়ি দেখা যায়৷ আসতে আসতে, সাদা, সবুজ, বেগুনী, গোলাপি সব ই দেখে ফেললাম ৷ আমি মেইন রাস্তায় এসে কি করব বুঝতে না পেরে আবার হাটা শুরু করলাম ৷ অনেক্ষন হয়ে গেল unknown নাম্বার থেকে আর ফোন আসছে না ৷ আমি ফোন টা বের করে রিফাত এর বাবা কে ফোন দিলাম
– স্লামুয়ালাইকুম আঙ্কল ভাল আছেন?
– – হে বাবা কেমন আছ ?
– জি আঙ্কল ভাল ৷
– – আঙ্কল রিফাত তো বাসায় নাই আপনি কি ঢাকায় নাকি ?
– না তো বাবা, আমি তো জামালপুর ,
– – ও আচ্ছা ৷ আচ্ছা তাহলে আঙ্কল রাখি
বলে ফোন রেখে দিলাম ৷ এবার ফোন দিলাম রিফাত এর আরেক বন্ধুকে ৷
– ইরফান ভাই ভাল আছেন ?
– – হ্যাঁ ভাই কি খবর ?
– এই তো ভাই , আচ্ছা ভাই রিফাত কি আপনার সাথে ?
– – না তো ভাই কেন ? কিছু হয়েছে নাকি ?
– না না তেমন কিছু না, পারলে একটু জানিয়েন তো, আমি ওকে পাচ্ছি না জরুরী একটা দরকার ছিল ৷
– – হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই
আমি ফোন রেখে দিলাম ৷ রিফাত এর ফোন নাম্বার আমার কাছে আছে ৷ আমি ওকে ফোন দিতে পারি ৷ কিন্তু ওরে ফোন না দিয়ে অন্যদের কেন দিচ্ছি জানি না ৷ আমার মনে হচ্ছে রিফাত কে ফোন দিলে ফোন বন্ধ পাব ৷

আমি বিশ্ব রোড এর ফ্লাই ওভার ধরে হাঁটছি ৷ আজকে কোনও কারণে traffic jam নাই ৷ ঢাকা শহর, মাঝে মধ্যে আমাদের সাথে রসিকতা করে ৷ আজকে মনে হয় এমন একটা দিন ৷ আমি যে পথ ধরে হাঁটছি এ পথ ধরে মানুষ তেমন হাটে না ৷ বিশ্ব রোড বলে কথা ৷ মানুষ সাই সাই করে গাড়ি ছুটিয়ে যাচ্ছে আর অবাক করে আমার দিকে তাকাচ্ছে ৷ আমি যদিও বুঝলাম না তার কারন কি ৷ আমার বিপরীত দিক থেকে একজন লোক আসছে ৷ তার পড়নে সাদা পাঞ্জাবী পায়জামা তার উপর উনি বেশ দামী একটা সোয়েটার পড়েছেন ৷ দেখতে খুব জ্ঞানী লাগে ৷ মাথায় কাঁচা পাকা চুল ৷ মোচ গুলোও কাঁচা পাকা ৷ কাল ফ্রেম এর চশমা পড়েছেন৷ তিনি আমার কাছে আসতে আমি উনাকে জিজ্ঞেস করলাম
– uncle
– – জী আমাকে বলছেন ?
– জি জি , এখানে তো আর কেউ নাই
– ওহ, হ্যাঁ বলেন ৷
যদিও আমার ইচ্ছা ছিল, তাকে রিফাত এর কথা জিজ্ঞেস করব কিন্তু আমি বললাম
– আচ্ছা আপনি কি scientist ?
লোকটা মোটেও বিরক্তি দেখাল না
– কেন বল তো ?
– আমি একটা research করছি ৷ মানুষের appearance এর সাথে তার পেশা ও কাজ কর্মের কদ্দুর relation আছে তাই নিয়ে ৷
– আচ্ছা আচ্ছা তাই নাকি, দারুণ তো ৷ বেশ ৷
– তো, আপনি কি scientist ?
– না না তেমন কিছু না, আমি সাহিত্যিক, গল্প উপন্যাস লিখি ৷
Scientist আর সাহিত্যিক দের মাঝে কি পার্থক্য আমি তা আজও বুঝতে পারি নাই , আমার কাছে এরা একই৷
– আচ্ছা আসল কথা বলি, আপনি কি রিফাত কে দেখেছেন ?
লোকটা মোটেই অবাক হল না,
– তুমি কোন রিফাত এর কথা বলছ?
– কে আবার আমার বন্ধু রিফাত
– তাকে কি আমি চিনি ?
– আপনি চিনেন কিনা আমি কি জানি , চেনার দরকার কি, তাকে রাস্তা ঘাটে দেখেছেন?
– আমি সম্ভবত দেখি নাই, তুমি কি তাকে খুঁজছ?
– না খুঁজলে আপনাকে জিজ্ঞেস করব কেন ?
– আমি সম্ভবত দেখি নাই ৷ তুমি কি তার কোনও ছবি দেখাতে পারবে ?
তাকে ছবি দেখানোর মত ধৈর্য আমার নাই ৷ আমি আমার পথে হাটা শুরু করলাম ৷ এখন দুপুর ৩ টা বাজে ৷ ৩ টা কি দুপুর ? নাকি বিকেল ? আমি এবার অপু কে ফোন দিলাম ৷ অপু রিফাত এর undergrad এর বন্ধু ৷ অপু আগে নিকুঞ্জ থাকত ৷ এখন অবশ্য কই থাকে কেউ জানে না ৷ অপু মারাত্মক briliant student ৷ ওর কাছে গেলে নিজেকে বোকা বোকা লাগার কথা যে কোনও মানুষের ৷ আমার অবশ্য যে কারো সামনেই নিজেকে বোকা বোকা লাগে ৷
– অপু
– কে বলেছেন ? (কোনও ভদ্রতা নাই ফোন ধরেই কে বলছেন!)
– অপু তুমি আমাকে চেন না, কিন্তু তুমি রিফাত কে চেন , আমাকে না চিনলে ও হবে ৷ রিফাত কে কি তুমি দেখেছ ?
– আরে বন্ধু তুমি ! কেমন আছিস,
– রিফাত কে দেখেছিস ?
– না রে, কেন কি হ
কথা শেষ হওয়ার আগে আমি ফোন কেটে দিলাম ৷ একজন পত্রিকা ওয়ালা আমার পাস দিয়ে যাচ্ছে ৷ পত্রিকা ওয়ালাদের হকার বলে কেন আমি বুঝি না ৷ যে বাদাম বেচে সে বাদাম ওয়ালা ৷ যে চানাচুর বেচে সে চানাচুর ওয়ালা ৷ কিন্তু যে পত্রিকা বেচে সে হকার ৷ পত্রিকা ওয়ালা কিছু marketing activity সম্পন্ন করল৷ কিন্তু আমি পত্রিকা না কেনায় সে ভীষণ হতাশ ৷ আমি পত্রিকা পড়ি না ৷ কিন্তু এই লোক আমার পিছু ছাড়তে নারাজ ৷ সে আমার কানের পামে ঘেন ঘেন করছে আর আমার সাথে হাঁটছে ৷
একটা গল্প বলি ৷ একবার আমি ট্রেনে করে কিশোরগঞ্জ যাচ্ছি ৷ এক পিচ্চি আমার পা ধরে বসে পড়ল ৷ আমি নিজেকে রাজা মহারাজা ভাবতে শুরু করলাম ৷ আমার পাশের বসা চাচা ভীষণ ক্ষেপে উঠলেন ৷ উনি নিশ্চয়ই jealous feel করছিলেন ৷ পাশের লোক রাজা হয়ে গেল ৷ কেন তার পা ধরে বসে পড়ল না, রাজা আর রাজত্বের অনুভূতি দারুণ ৷ তিনি বেশ কয়েকটা ঝাড়ি দিতেও ছেলেটা আমার পা ছাড়ল না ৷ প্রায় ১০ মিনিট আমার পা ধরে ছেলেটা বসে আছে ৷ আর একটু পর পর আমার দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে কি যেন বলছে ৷ আমি ভাবলাম নিচ্ছই আমার প্রজা কোনও অন্যায় করেছে ৷ আমার কাছে ক্ষমা চাইছে ৷ আমি আমার হাতটি তুলে তার মাথায় রাখলাম ৷ রাজা মহা রাজার মত গম্ভীর করে বললাম যা ক্ষমা করে দিলাম ৷
দুঃখের বিষয় ছেলেটা আমার কথা কি বুঝল আমি জানি না , সে একই ভাবে নির্বিকার হয়ে আমার পা ধরে ফেল ফেল করে তাকিয়ে থাকল ৷ একটু পড় দেখলাম আমার পাসে বসা বুড়ো টা ২ টাকার একটি নোট বের করে ছেলেটাকে দিতেই সে টাকা টি লুফিয়ে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল ৷
আমি মনে মনে ভাবলাম হায়, যতই টাকা বিলাও তুমি রাজা মহারাজা হতে পারবে না হে বুড়ো ৷ টাকা দিয়ে রাজ্য কেনা যায় না ৷ রাজত্ব বড় অদ্ভুত জিনিস ৷ দেখা যাবে সারা জীবন যে রাজা, প্রজাদের জন্যে করে যাবে, যাদের জন্যে জীবন বিলিয়ে দিবে, দিনের শেষে তারাই তোমাকে ভুল বুঝবে ৷ এক দল তোমাকে শূলে চড়াতে ও তারা পিছ পা হবে না ৷ আরেক দল ভীতু কাপুরুষ এর মত তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে ৷ দিন যাবে, বছর যাবে, যুগ পেরিয়ে যাবে ৷ কাপুরুষ দের মনে জমে থাকা তুষের অগ্নি স্ফুলিঙ্গ গুলো আস্তে আস্তে দাবানলে পরিণত হবে ৷ হবে কি ?

হাটতে হাটতে বনানী রেল স্টেশন এ চলে এলাম ৷ রেল স্টেশন কোনও কারনে আমার প্রিয় যায়গা গুলোর একটা ৷ নানা রকম মানুষ ৷ কেউ আসছে কেউ যাচ্ছে ৷ কারো মুখে আনন্দ, কারো বিষাদ ৷ কোনও কারনে আজকে ষ্টেশন টা ও খালি পরে আছে ৷ খালি প্রায় একটি ট্রেন মন খারাপ করে দারিয়ে আছে ৷ তার যাত্রীদের জন্যে অপেক্ষা করছে ৷ আমি কাউন্টার এর পাশ থেকে দু কাঁপ কফি নিয়ে এসে একটা বেঞ্চ এ বসলাম৷ সকাল থেকে হাটতে হাটতে ক্লান্ত লাগছে ৷ কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে মনে হল সারা জীবন এখানেই কাটিয়ে দেওয়া যেত ? আমার পাশে এসে একজন যুবক বসল ৷ তার কাঁধে বিশাল বড় একটা ব্যাক প্যাক ৷ তার মনটা ভীষণ খারাপ বলে মনে হচ্ছে ৷ বিষর্ম , ঠোট মুখ শুকিয়ে আছে ৷ আমি আমার অপর কাপটা তার দিয়ে বাড়িয়ে দিলাম ৷ সে প্রথমে হা করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল ৷ কিন্তু কোনও কথা বলল না ৷ আমি বললাম নিন, সে নিল ৷
বেশ সময় নিয়ে সে কফি টা খেল ৷ আমি জিজ্ঞেস করলাম আরেক কাপ খাবেন ? সে মাথা নেড়ে না করল ৷ আমি তাকে অভয় দিয়ে বললাম ,
– দেখুন, জীবনে চলার পথে মাঝে মধ্যে এমন বিব্রত কর পরিস্থিতি তে পরতে হয় ৷ বন্ধু বান্ধব জিনিষ টা দারুণ, তবে এটাও সত্যি মানুষ চেনা খুব কষ্টের ব্যাপার ৷ যেই বন্ধুর জন্যে জীবন দিয়ে দিতে নিবেন দেখবেন তারাই সামান্য ব্যাপার এ বিট্রে করবে ৷
–  কি বলতে চা
আমি তার কথা থামিয়ে দিয়ে বলে গেলাম
– এত কষ্ট করে টিকিট গুলো কিনেছেন, দেখে দেখে গরীব মানুষ গুলকে টিকিট গুলো দিয়ে দেন ৷ দেখবেন মনটা ভাল লাগছে ৷
– তার পর সোজা যেয়ে একটা বাসের টিকেট কিনুন, কক্সবাজার এর ৷ একা একা অনেক যায়গাতেই ঘুরতে যাওয়া যায়না ৷ কিন্তু আপনি যত একটা হবেন দেখবেন বঙ্গোপসাগর আপনাকে তত আপন করে বুকে টেনে নিয়েছে ৷ বিশ্বাস রাখতে পারেন ৷
– আপনি কি বলছেন এসব ৷
আমি মনে মনে একটু হাসলাম ৷ তার কথার উত্তর না দিয়ে আমার ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফিটায় চুমুক দিতে দিতে সামনের ট্রেন টাতে উঠে গেলাম ৷ সেই দিনটার কথা মনে পড়ছে ৷ আমার জীবনেও এমন একটা দিন ছিল ৷ বন্ধু বান্ধব নিয়ে থাকতাম ৷ তাদের জীবনের সব মনে করতাম ৷ একবার সারাদিন কষ্ট করে নিজের পকেটের পয়সা দিয়ে ৬ টা এসি কামড়ার টিকিট কিনেছিলাম ৷ উদ্দেশ্য ছিল উত্তর বঙ্গ ৷ সময় মত কেউ আসে নি ৷ তখন আমার পকেটে মাত্র অল্প কিছু টাকা কাড়ন সব টাকা আমি টিকিট কেনাতেই শেষ করে ফেলেছি ৷ ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম ভীষণ ৷ আমি বুঝতে পারলাম আমার দু চোখে জল টল মল করছে ৷ রিফাত এর কি হল একটা খোজ নেওয়া দরকার ৷ ওর বাবাকে আবার ফোন দিলাম ৷