Tags

, , , , , , , ,

উদ্দেশ্য ছিল পুরান ঢাকা যাব, শুনেছি ওখানকার খাবার দাবার নাকি খুব সুস্বাদু ৷ বিশেষ করে বিরিয়ানির নাকি জবাব নাই ৷ সেই উদ্দেশ্য নিয়েই বের হয়েছিলাম ৷ বাসা থেকে বের হয়ে দেখলাম অল্প স্বল্প গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে ৷ যাক বাবা বাচা গেল বেশ গরম পড়েছে ৷ এমন দিনে খিচুরি খেলে বেশ হত ৷ তবে বৃষ্টির দিনে খিচুরি খেতে কেন বেশি মজা লাগবে বা ঐ দিন কেন খিচুরি খাওয়া লাগবে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে ৷ এটার কোনো যুক্তি দ্বারা করাতে পারলাম না ৷

বৃষ্টি আর চা

বৃষ্টি আর চা

পারলাম না বল্লে ভুল হবে ৷ একটা পেরেছি কিন্তু সেটা কেউ মেনে নিবে না ৷

খিচুরি রাধা সব চেয়ে সহজ কাজ ৷ আপনি এক পাতিল খিচুরি আর একটা ডিম ভেজে পরিবারকে এর মানুষ কে সার্ভ করবেন কেউ অভিযোগ করবে না ৷ বৃষ্টির মাঝে কারো কাজ কর্ম করতে ইচ্ছে হয় না ৷ সবার মন উদাস থাকে ৷ তাই বাড়ির রাঁধুনি রা বেশি কাজ থেকে বাঁচতে খিচুরি চুলোয় চাপিয়ে দেয় এভাবেই এটা একটা রীতি ৷

যাই হোক, আমার যুক্তি আপনার ভাল লাগলে ভাল না লাগলে আরও ভালো ৷ তার মানে আপনি অন্যের কথা এমনি এমনি মেনে নেন না ৷ তবে আমার কথা না মানলে আপনার যুক্তিটা কি আমার জানার খুব ইচ্ছা ৷ জানাবেন ৷
এসব হাটতে হাটতে কখন যে রিক্সায় উঠে বসেছি আমি জানি না ৷ কোথায় রিকশা করেছি কত টাকা চুক্তি হয়েছে কিছুই জানি না ৷ থাক সে চিন্তা, কাকরাইল থেকে পুরান ঢাকা যেতে হলে যে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার কথা সেদিকেই যাচ্ছে ৷
এই এলাকার নাম কাকরাইল কেন সেটা কেউ বলতে পারল না ৷ জানার খুব ইচ্ছে ছিলা ৷ আমি সেগুন বাগিচা এর গলি দিয়ে প্রেসক্লাব এর রাস্তায় রিকসা উঠতে ঝুম করে বৃষ্টি নেমে গেলে একদম তুফান ৷ রিকশাওয়ালা চাচা আমাকে নামিয়ে পর্দা বের করলেন সিটের নিচ থেকে ৷ এই সিটের নিচ পর্দা রাখার মত আহাম্মক এর কাজ কেন উনারা করে আমি বুঝে কুল কিনারা পেলাম না ৷ পর্দা বের করতে করতে আমার সে দিনকার মত ২য় বার স্নান করা শেষ ৷ আমি চাচা কে বললাম চাচা চা খাবেন ?
সে আমার দিকে মহা বিরক্তি নিয়ে তাকাল ৷
আরে উঠেন ভিজতাছেন তো…
সে না হয় ভিজলাম, ভিজেই তো গেছি, আসেন চা খাই
সামনে একটা টং এর দোকানের দিকে আমি হাটতে শুরু করলাম ৷ চাচা মিয়ে রিকশা এক-সাইড করে আমার পেছন পেছন আসল ৷ বলল
ভাড়া দিয়া দেন আমি যাই গা
আমি তাকে অভয় দিয়ে বললাম
ওমা, আমি পুরান ঢাকা যাব না ? আপনাকে একটু ভাড়া বাড়িয়ে দেব নে ৷ আসেন বসেন চা খান ৷ বেশিক্ষণ লাগবে না ৷
ভাড়া বাড়িয়ে দিব শুনে চাচা মিয়া শান্ত হল ৷ তবে চা সে খাবে না ৷ আমি বললাম
চা না খান বসেন ৷ আমি খাচ্ছি ভিজে কি করবেন ৷
সে বসল ৷
আমি যখন গরম চা এ চুমুক দিলাম মনে হল চা বিক্রেতার গুন আছে ৷ বেশ মজার চা ৷ আগে তার চা খাইনি কখন ও ৷ এটা একটা বিশাল লস ৷ আগামি ১ মাস ডেইলি ২ বার তার চা খেতে হবে ৷ এত মজার চা ৷ আমি এই তথ্য চাচা কে জানালাম ৷ অবশেষে উনিও চা নিলেন ৷ আমি বেশ মজা করে কাপে দ্বিতীয় চুমুক দিতে দিতে চাচা কে বললাম ৷ জানেন আমার জীবনে উনার চা এর প্রথম চুমুক টাই ছিল সব চেয়ে মজার ৷ এর পর যত চুমুক দিব একটার চেয়ে আরেকটা কম মজার মনে হবে ৷
চাচা, আমার কথায় হেসে দিলেন,
হাসা কথা, এইডা অইল বৌ এর লগে পরথম রাইতের লাহান
আমার এ ব্যাপারে বাস্তব অভিজ্ঞতা নাই তবে চাচা অভিজ্ঞ মানুষ বলেই মনে হল ৷ আমি তা মেনে নিলাম ৷
আফনে তো মনে অয় বিয়া করসুইন না আফনে বুজবাইন না ৷
আমি তার কথা সম্মতি দিলাম ৷
চাচা এ বিষয়ে খুব কথা বলতে আগ্রহী মনে হল আমি তাকে উৎসাহ দিতে বললাম
পরিবারে কয় জন চাচা ? কে কে আছে?
তা বাবা , আমার দুই হান বউ, ৫ খান ঝি, আর ৩ খান ফুলা
তার কথা শুনে আমি বেশ মজা পেলাম ৷ তিনি আমাকে জানালেন তিনি কমলাপুর থাকেন ৷ তার সাথে তার এক ছেলে ও থাকে ৷ তার সেই ছেলে ঢাকা ইউনিভার্সিটির ফিজিক্স এ পড়া লেখা করে ৷ হল পায়নি বলে বাপার সাথেই থাকে ৷ হলে রাজনীতি না করলে সিট পাওয়া যায় না তাই তার ছেলের দুর্গতি ৷
কথায় কথায় আরও জানতে পারলাম চাচার বেশি দিন আর রিক্সা চালানোর ইচ্ছে নাই ৷ তিনি ২ টা রিক্সা কেনার টাকা জমিয়েছেন ৷ তার ছেলে রা ও তাকে সাহায্য করেছেন ৷ দুটো রিক্সা খাটিয়ে উনি আসতে আসতে ব্যবসা গড়ে তুলতে চান ৷
আমার মন টা খারাপ হয়ে গেল ৷ লোকটার মনে কত আশা কত স্বপ্ন ৷ মানুষ স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে ৷ স্বপ্ন মানুষ কে বাঁচিয়ে রাখে ৷ উনি যদি জানত আজ রাতই হবে উনার শেষ রাত ৷ তাহলে কি উনি এই স্বপ্ন দেখত ? আজকের দিনটা উনি যে ভাবে কাটাচ্ছে এভাবেই কাটাত ? উনি হয়তো উনার পরিবার হতে বিদায় নিত ৷ হয়তো একটু ভাল মন্দ খেত ৷ ভার্সিটিতে পড়া ছেলেটাকে পরিবার কে দেখতে বলে যেত ৷
আমি চাচা কে বললাম চাচা বাড়িতে ফোন আছে?
হ, থাকব না কেন ? আমি তো গরিব না, আইজকাইল ১ বেলা খাইলে ও তো মোবাইল থাহে ৷
কথা ঠিক, আমি মাথা নাড়লাম, বললাম
পরিবার রে একটু ফোন লাগায়েন তারা আপনার কথা স্মরণ করে অনেক দিন তো কথা হয় না…
চাচার মুখটা কাল হয়ে গেল, পরক্ষনে দুটো জ্বল জ্বল করে উঠল,
তা হয় না, যাউক গিয়া অসুবিধা কি আইজ রাইত ই বাড়ি যামু-গানে , অসুবিধা কি , রাইতের লঞ্চ এ খেতা বালিশ নিয়া উঠে পড়মু সক্কালে ফৌছাই যামু, হে হে…
আমার আর চাচার চা খাওয়া শেষ হল ৷ বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নাই ৷ তুমুল ঝড় বৃষ্টির ঢাকার আকাশে জেঁকে বসেছে ৷ ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার হাঁচি এসে আমাকে জানিয়ে দিয়ে গেছে সামনে দুর্গতি আছে ৷ আমি রিকশায় চড়ে বসলাম ৷