মকবুল সাহেবের কিন্তু
কিশোরগঞ্জে আমাদের বাড়ির ঘাটে ছমির মাঝি নৌকা বেঁধে রাখত। ভরা বর্ষার এক দুপুরে বৈঠা তুলে রেখে সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ছোটমিয়া, দুনিয়ার সবচেয়ে বদমেজাজি জানোয়ারটা কে বলুন দেখি। আমি তখন সবে ক্লাস এইটে উঠেছি, জ্ঞানের ভারে ঘাড় টনটন করছে, তাই দেরি না করে বললাম, বাঘ। সে পান চিবোতে চিবোতে ঘাড় নাড়ল, উঁহু, বাঘের পেট ভরলে বাঘ ঘুমায়। সবচেয়ে বদমেজাজি হল সেই কুকুর, যে গোয়ালঘরের খড়ের গাদায় আরাম করে শুয়ে থাকে, নিজে এক গোছা খড়ও খায় না, অথচ গরুটাকে খড়ের কাছে ঘেঁষতেও দেয় না। কথাটা তখন হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম, কারণ হাওড়ের পানি যেদিন কানায় কানায়, সেদিন দুপুরে দর্শনচর্চার চেয়ে জরুরি কাজ হল নৌকা থেকে ঝাঁপ দেওয়া। বিশ বছর পরে ঢাকার এক ব্যাংকের সাততলায়, মানবসম্পদ বিভাগের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত একটি ঘরে বসে টের পেলাম, ছমির মাঝি স্কুলের বারান্দাটাও মাড়ায়নি, কিন্তু মানুষ চিনত অনেক ডক্টরেটের চেয়ে ভালো।
আমাদের বিভাগেরই এক তরুণ কর্মকর্তা, নাম ধরুন শফিক। বয়স তিরিশ ছোঁয়নি, চোখে সেই জিনিসটি আছে, লোকে যাকে মেধা বলে, যেটা ইন্টারভিউ বোর্ডে ধরা পড়ে না, কিন্তু ছয় মাসের মধ্যে ফাইলে ধরা পড়ে। ব্যাংক সেবার নতুন একটি এইচআরআইএস সফটওয়্যার কিনল, অর্থাৎ হাজিরা, ছুটি, বেতন আর কর্মমূল্যায়নের হিসাব এক জায়গায় রাখার ডিজিটাল ব্যবস্থা। ভেন্ডর এসে তিন দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে চলে গেল, তার পরে দেখা গেল গোটা বিভাগে একজন মানুষই বুঝেছে জিনিসটা কোথায় কী করে, এবং সে হল শফিক। সে নোট লেখে, তাতে বানান ভুল থাকে না, তিনবার ফেরত পাঠাতে হয় না, এবং সবচেয়ে অমার্জনীয় অপরাধ যেটি, সে নোটের শেষে লিখে দেয় কী কী বিকল্প আছে এবং কোনটিতে ব্যাংকের কত টাকা বাঁচে। পাঠক, এই জায়গাটিতেই তার কপাল পুড়ল।
কারণ তার বিভাগীয় প্রধান, অর্থাৎ যাঁর কলমের ওপর বিভাগের সব মূল্যায়ন আর সুপারিশ নির্ভর করে, ধরুন তাঁর নাম মকবুল সাহেব, বাইশ বছরের চাকরিজীবনে অনেক কিছু শিখেছেন, কেবল ওই দুটি জিনিস শেখেননি, নতুন কিছু শেখা, এবং নিজের চেয়ে ভালো কাউকে সহ্য করা। মকবুল সাহেবের প্রকৃত দক্ষতা একটিই, টিকে থাকা, এবং সে বিদ্যায় তিনি অধ্যাপক পর্যায়ের মানুষ। তিনি কোনও সভায় কখনও ভুল বলেন না, কারণ তিনি কিছুই বলেন না। তিনি কোনও সিদ্ধান্ত নেন না, কারণ সিদ্ধান্তের সঙ্গে দায় নামক একটি বস্তু জড়িত।
বিশ বছরে তিনি একটি অস্ত্রই ঘষে ঘষে ধারালো করেছেন, এবং সেটি বাংলা ভাষার সবচেয়ে নিরীহ চেহারার শব্দ, কিন্তু। ভাষাতাত্ত্বিকেরা এই শব্দটির যথেষ্ট গবেষণা করেননি বলে আমার আক্ষেপ আছে। কারণ কর্পোরেট বাংলায় কিন্তু হল সেই ছুরি, যা রক্ত বের করে না অথচ শিরা কেটে দেয়। ছেলেটা মেধাবী, কিন্তু। কাজটা ভালোই করেছে, কিন্তু। উপস্থাপনা চমৎকার হয়েছে, কিন্তু। এই কিন্তুর পরে কী আছে তা কেউ জানতে চায় না, কারণ কিছুই নেই, কিন্তুটাই মাল, বাকিটা মোড়ক।
ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় শফিকের নাম উঠল পদোন্নতির তালিকায়, মকবুল সাহেব চশমাটা খুলে কাচ মুছতে মুছতে বললেন, ছেলেটাকে আমি স্নেহ করি, কিন্তু একটু কাঁচা, আর একটু সময় দিলে ভালো হয়। ব্যস। তেরোটি শব্দ, আর তাতে ছেলেটির একটি বছর গেল। লিফটে দাঁড়িয়ে অডিটের এক ভদ্রলোককে তিনি বললেন, শফিক ছেলে ভালো, কিন্তু একটু একলা চলে, টিম প্লেয়ার নয়। সাতাশ সেকেন্ডের কথা, আর তাতে একটি সুনাম গেল। খেয়াল করবেন, ইনি কোথাও মিথ্যা বলছেন না, কারণ মিথ্যার একটা ঝুঁকি আছে, মিথ্যা প্রমাণ করা যায়। ইনি বলছেন ধারণা, আর ধারণার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয় না। এই হল আসল কারুকাজ, বিষটা মেশানো থাকে সহানুভূতির চিনিতে।
শফিক প্রথমে যা করল, তা প্রায় সব তরুণই করে, অর্থাৎ ভুলটাই করল। সে পাল্টা ফিসফিসানি শুরু করল। ক্যান্টিনে বসে দুজন সহকর্মীকে বলল, মকবুল সাহেব তো কিছুই জানেন না, এক্সেলে ভি-লুকআপ পর্যন্ত পারেন না, অথচ ওটা এক্সেলের প্রথম পাঠ। কথাটা সত্য ছিল, এবং সত্য বলেই বিপজ্জনক ছিল, কারণ ক্যান্টিনের বাতাস ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কের চেয়ে দ্রুতগতির, এবং সে বাতাসে কথাটা মকবুল সাহেবের ঘর পর্যন্ত পৌঁছাতে চব্বিশ ঘণ্টাও লাগেনি। ফিরে এল আরও পালিশ হয়ে, এবার শফিক অহংকারী, শফিক সিনিয়রদের সম্মান করে না, শফিকের অ্যাটিটিউড প্রবলেম আছে। পাঠক, লক্ষ করুন, ছেলেটি এতদিন ছিল অভিযোগকারী, এক কাপ চায়ের মধ্যে সে হয়ে গেল অভিযুক্ত।
সেদিন সন্ধ্যায় সে আমার ঘরে এসে বসল, মুখ থমথমে, বলল, আমি চাকরি ছেড়ে দেব। আমি বললাম, দাও, তাতে মকবুল সাহেবের রাতের ঘুম আরও গভীর হবে, উনি পরের দিন সভায় বলবেন, দেখলেন তো, বললাম না ছেলেটার স্থিরতা নেই। তারপর চা ঢেলে বললাম, শোনো, রোগটার নাম আগে ঠিক করো, তারপর ওষুধ। তোমার বসের সমস্যা তুমি নও, তোমার বসের সমস্যা হল আয়না, আর তুমি হলে সেই আয়না। যে মানুষ নিজের অক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন অথচ তা শোধরাতে অক্ষম, তার কাছে যোগ্য অধস্তন কোনও সম্পদ নয়, তার কাছে সে হল প্রতিদিনের নীরব অভিযোগপত্র। তাই সে তোমাকে ঘৃণা করে না, সে তোমাকে ভয় পায়, আর ভয় পাওয়া মানুষ ঘৃণা করা মানুষের চেয়ে ঢের বেশি বিপজ্জনক। কথাগুলো বলতে বলতে ছমির মাঝির সেই কুকুরটির কথা মনে পড়ল, খড় সে নিজে খাবে না, গরুকেও খেতে দেবে না, কারণ খড়ের গাদাটাই তার একমাত্র বিছানা।
এখন কী করবে। প্রথম কথা, ফিসফিসের বিরুদ্ধে ফিসফিস নয়। কাদার সঙ্গে কুস্তি লড়লে বিজয়ী-বিজিত দুজনকেই একই ধোপার কাছে যেতে হয়, আর অফিসে ধোপা নেই।
দ্বিতীয় কথা, কাগজ। আমাদের গ্রামের মৌলবি সাহেব ফারসি পড়াতেন, বলতেন, বুদ্ধিমান শত্রু বোকা বন্ধুর চেয়ে ভালো। আমি বলি, ওই দুটোর চেয়েও ভালো একখানা তারিখ-বসানো ই-মেইল। মুখের কথা বাতাসে মেলায়, কাগজ ঘুমায় না। সভা শেষে দুই লাইনের নোট পাঠাও, আজ যা যা সিদ্ধান্ত হল, আমার ওপর যা যা দায়িত্ব পড়ল, স্যারকে অনুলিপি। ভদ্রভাবে, বিনীতভাবে, কিন্তু নিয়ম করে। ছয় মাস পরে যখন কেউ বলবে ছেলেটা কাজ করে না, তখন তোমাকে গলা চড়াতে হবে না, একটা ফোল্ডার খুললেই হবে।
তৃতীয় কথা, তোমার কাজকে একটি ঘরের চার দেওয়ালে বন্দি রেখো না। যে কর্মীর পরিচয় কেবল তার বসের মুখে, তার ভাগ্য সেই মুখের মেজাজের ওপর নির্ভরশীল। ঋণ বিভাগের কাজে সাহায্য করো, আইসিটির লোকটির সঙ্গে বসে সমস্যা মেটাও, অডিটের প্রশ্নের জবাব সময়মতো দাও, প্রশিক্ষণে গিয়ে চুপ করে বসে থেকো না। তাতে চার-পাঁচটি বিভাগে চার-পাঁচজন মানুষ তৈরি হবে, যাঁরা তোমার সম্পর্কে বলা কিন্তুটা শুনে ভুরু কোঁচকাবেন। বদনামের বিরুদ্ধে একমাত্র টিকা হল বহু সাক্ষী।
চতুর্থ কথা, তাঁকে চমকে দিয়ো না। ভালো কাজ লুকিয়ে করে হঠাৎ বড় সাহেবের সামনে ফাঁস করার মধ্যে যে বীরত্ব আছে বলে তোমরা ভাবো, ওটা বীরত্ব নয়, ওটা আত্মহত্যা। যা করবে জানিয়ে করবে, অর্থাৎ প্রতিটি ভালো কাজের খবর আগে তাঁর কাছে পৌঁছাবে, তাতে তাঁর হাত থেকে সবচেয়ে বড় অস্ত্রটাই কেড়ে নেওয়া হবে, অর্থাৎ ওই কিন্তু।
পঞ্চম কথা, এবং এটি সবচেয়ে নিষ্ঠুর অস্ত্র, লিখিত মূল্যায়ন চেয়ে বসো। বিনয়ের সঙ্গে লিখে পাঠাও, স্যার, আমার কোন কোন জায়গায় ঘাটতি আছে দয়া করে লিখে জানালে আমি শোধরানোর চেষ্টা করব। বিশ্বাস করো, এই একটি ই-মেইলের সামনে ওই ধরনের মানুষ অসহায়। কারণ তাঁর অস্ত্র অস্পষ্টতা, আর তুমি তাঁকে স্পষ্ট হতে বলছ। হয় তিনি লিখবেন না, তাতে তোমার নথিতে জমা হবে তাঁর নীরবতা, নয়তো লিখবেন কিছু একটা ফাঁপা কথা, যা পরের বছর কমিটির সামনে নিজেই মুখ থুবড়ে পড়বে।
ষষ্ঠ কথা, যদি ব্যাপারটা ধারণার সীমা ছাড়িয়ে যায়, যদি মিথ্যা তথ্য লেখা হয় মূল্যায়নপত্রে, যদি তোমার প্রাপ্য প্রশিক্ষণ বা পদোন্নতি নথিভুক্ত মিথ্যার জোরে আটকায়, তবে আর অপেক্ষা নয়, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে আনুষ্ঠানিক পথে যাও, অর্থাৎ মানবসম্পদ বিভাগ বা অভিযোগ নিষ্পত্তির যে কাঠামো তোমার প্রতিষ্ঠানে আছে, সেই কাঠামোর দরজায় লিখিতভাবে দাঁড়াও। কিন্তু যাওয়ার সময় আবেগ বাড়িতে রেখে যেয়ো। অভিযোগে লিখো না উনি আমাকে দেখতে পারেন না, লিখো তারিখ, লিখো ঘটনা, লিখো নথির নম্বর, লিখো কোন সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠানের কত টাকা বা কত সময় নষ্ট হল। মনে রেখো, প্রতিষ্ঠান তোমার দুঃখে কাঁদবে না, প্রতিষ্ঠান তার নিজের ক্ষতির হিসাব দেখে নড়ে বসবে।
আর সপ্তম কথা, ধৈর্য। এই ধরনের মানুষ সাধারণত নিজের ওজনেই একদিন ধসে পড়েন, কারণ যে দেয়ালের কোনও ভিত নেই, তার শত্রু বাইরের ঝড় নয়, তার শত্রু সময়। তবে সময়েরও একটা সীমা আছে, এবং সেই সীমাটা তোমাকেই ঠিক করতে হবে। গাছ যদি দেখে কুয়ায় জল নেই, মালী কোদাল ধরতে শেখেনি, এবং শিকড় ছড়ানোর জায়গাটুকুও কেটে দেওয়া হচ্ছে, তবে গাছের পক্ষে বাগান বদলানো পলায়ন নয়, ওটা বুদ্ধি।
এতগুলো কথা একটানা বলে গেছি, খেয়ালই করিনি কখন বাইরে সন্ধ্যা নেমে গেছে। সাততলার জানালার কাচে ততক্ষণে নিচের রাস্তার গাড়ির লাল বাতির সারি, পাশের মসজিদের আজান শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ, করিডরে ঝাড়ুদারের ট্রলির শব্দ। শফিক এতক্ষণ একটি কথাও বলেনি, কাপটা দুহাতে ধরে বসে আছে, একবারও চুমুক দেয়নি।
তারপর সে মুখ তুলে বলল, ঠিক আছে স্যার, সবই তো বুঝলাম, কাগজ রাখব, সাক্ষী বাড়াব, ধৈর্য ধরব। কিন্তু ইনসাফটা কোথায়। প্রশ্নটা সে করল খুব নিচু গলায়, অভিযোগের সুরে নয়, ক্লান্তির সুরে, এবং আমি জানি এই প্রশ্নটির কোনও ভালো উত্তর কারও কাছে নেই। যা সত্য তাই বললাম, ইনসাফ জিনিসটা ব্যাংকের কোনও তলায় দলিল করে রাখা নেই, ওটা মাঝে মাঝে দেরি করে আসে, আর যেদিন আসে সেদিন কেউ ঘোষণা দিয়ে আসে না। আমার এই সামান্য চাকরিজীবনে দুটি ঘটনা দেখেছি, একটিতে ইনসাফ এসেছিল সাত বছর পরে, নতুন এক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের হাত ধরে, তখন সেই কর্মীর দুটি চুল পাকা। আর একটিতে আজও আসেনি, এবং যাঁর ঘাড়ে দায় ছিল তিনি সসম্মানে অবসরে গিয়ে এখন নাতিকে স্কুলে দিয়ে আসেন। এর বেশি কিছু বললে সেটা সান্ত্বনা হত, সত্য হত না। চা ততক্ষণে ঠান্ডা।
ছেলেটি উঠে দাঁড়াল, ব্যাগটা কাঁধে নিল, দরজা পর্যন্ত গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, আর কিছু বলার আছে। থাকলে আজই বলে ফেলুন। আমি একটু ভাবলাম, কারণ কথাটা বললে ছেলেটির আজকের রাতটা আরও খারাপ যাবে, আর না বললে হয়তো তার পরের কুড়িটা বছর খারাপ যাবে। তাই বললাম, আছে, এবং সেটাই আসল কথা। এতক্ষণ যা বললাম সবই আজকের রোগের ওষুধ, এবার যেটা বলব সেটা ভবিষ্যতের টিকা। মকবুল সাহেব তোমার সবচেয়ে বড় বিপদ নন। তোমার সবচেয়ে বড় বিপদ হল, বছর কুড়ি বাদে, যেদিন তুমি বিভাগীয় প্রধান হবে এবং তোমার ঘরে এক তরুণ ঢুকে এমন একটা নোট নামিয়ে রাখবে যা তোমার চেয়ে ভালো, সেদিন তোমার গলার ভেতর থেকে কোন শব্দটা প্রথম বেরিয়ে আসে। যদি বেরোয় বাহ্, তবে তুমি জিতেছ। আর যদি বেরোয় কিন্তু, তবে বুঝবে, মকবুল সাহেব চাকরি ছেড়ে যাননি, তিনি কেবল চেয়ার বদল করেছেন।
